বেসরকারি খাতের দেশের সবচেয়ে বড় ব্যাংক এখন তীব্র আর্থিক সংকটে

0
74

ব্যাংকটি হচ্ছে ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড। মালিকানা বদলের পর মাত্র ১৫ মাসেই অব্যবস্থাপনা ও পারস্পরিক দ্বন্দ্বের কারণে ব্যাংকটির এই হাল হয়েছে।

এর আগে সরকারি খাতের সবচেয়ে ভালো ব্যাংক বেসিক ব্যাংকের একই হাল হয়েছে। সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের কারণে বর্তমান সরকারের সময়েই ব্যাংকটি তীব্র আর্থিক সংকটে পড়ে আছে।

২০১৭ সালের জানুয়ারিতে ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা বদলের পর এই প্রথম বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়ল ব্যাংকটি। টাকার অভাবে ইসলামী ব্যাংক ঋণ দেওয়ার কার্যক্রম ছোট করে এনেছে। একসময় আমানতকারীরা ছুটতেন ইসলামী ব্যাংকের পেছনে, এখন দেশের সবচেয়ে বড় এ ব্যাংক শুধু আমানতের পেছনে ছুটছে।

এরই মধ্যে আবার কয়েক দফায় ব্যাংক ব্যবস্থাপনার পরিবর্তন হয়েছে। একজন অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এএমডি) ও তিনজন উপব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ (ডিএমডি) একযোগে পাঁচজনকে পদত্যাগ করতে হয়েছে। এ ছাড়া নিজেদের দ্বন্দ্বে ব্যাংক ছেড়েছেন ভাইস চেয়ারম্যান আহসানুল আলম। সর্বশেষ ১৭ এপ্রিল পদত্যাগ করেছেন পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান আরাস্তু খান। জানা গেছে, বড় অঙ্কের ঋণ প্রস্তাব অনুমোদন নিয়েও ব্যাংকটির নতুন মালিকদের সঙ্গে পরিচালনা পর্ষদের দূরত্ব তৈরি হয়েছিল।

মালিকানা ও ব্যবস্থাপনায় আমূল পরিবর্তনের ১৬ মাসের মাথায় ব্যাংকটির এই সংকট দেশের বিশিষ্ট ব্যাংকার, আমানতকারী ও বিনিয়োগকারীদের চিন্তায় ফেলেছে। কেননা, দেশের সবচেয়ে বড় ব্যাংক সংকটে পড়লে এর প্রভাব পড়ে দেশের পুরো আর্থিক খাতে। মূলত, গ্রাহকদের আস্থায় চিড়, অব্যবস্থাপনা, একটি নির্দিষ্ট গ্রুপের কাছে রাতারাতি পুরো ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়া এবং কয়েকজন পরিচালকের অযাচিত হস্তক্ষেপের কারণে ব্যাংকটি এমন দুরবস্থার মধ্যে পড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আসার পর থেকে অনেকের কাছে বিষয়টি ধোঁয়াটে মনে হয়েছে। বিনিয়োগ-আমানত অনুপাতটা ৯২ শতাংশে নিয়ে যাওয়া ঠিক হয়নি। এটা স্বাভাবিক যে ঋণ দেওয়ায় আগে এত আগ্রাসী হওয়ায় এখন রক্ষণশীল হতেই হবে।

সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, যেকোনোভাবেই হোক আমানতকারীদের কাছে এমন একটি বার্তা রয়েছে যে, ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ একটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর কাছে। এটা দূর করতে হবে। ইসলামী ব্যাংক যেহেতু দেশের বড় ব্যাংক এবং এর ক্ষতি মানে দেশের ক্ষতি, তাই বাংলাদেশ ব্যাংককে এর ব্যাপারে বিশেষ নজরদারি রাখতে হবে। অর্থাৎ পর্ষদ যাতে ঠিক ভূমিকা পালন করে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ যাতে না থাকে।

আমানত কম, ঋণে আগ্রাসী
ইসলামী ব্যাংক থেকে পাওয়া তথ্য-উপাত্তে দেখা যায়, পরিবর্তনের আগমুহূর্তেও ব্যাংকটিতে ১০ হাজার কোটি টাকার মতো বিনিয়োগযোগ্য তহবিল ছিল। কিন্তু পরিবর্তনের পর তারা যে পরিমাণ আমানত সংগ্রহ করেছে, ঋণ দিয়েছে তার চেয়ে অনেক বেশি। সংকটের কারণও সেটাই। এমনকি অর্থসংকটে পড়ে সরকারের ইসলামী বিনিয়োগ বন্ডে থাকা টাকাও তুলে নিয়েছে ব্যাংকটি।

ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের শুরু থেকে ২২ এপ্রিল পর্যন্ত ব্যাংকটিতে আমানত এসেছে ১ হাজার ৪৬৬ কোটি টাকা, তবে এ সময়ে ঋণ বিতরণ হয়েছে ৪ হাজার ৩১৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ এই সময়ে যে পরিমাণ আমানত এসেছে, তার তিন গুণ ঋণ দিতে হয়েছে ব্যাংকটিকে।

ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বেঁধে দেওয়া ঋণ-আমানত অনুপাত (এডিআর) সীমা ৮৯ শতাংশ অতিক্রম করেছে ব্যাংকটি। ঋণ-আমানত অনুপাতকে ইসলামী ব্যাংক বলে থাকে বিনিয়োগ আমানত অনুপাত (আইডিআর)। এই এডিআর বা আইডিআর এখন ৯২ শতাংশের কাছাকাছি। সীমা ছাড়িয়ে ইসলামী ব্যাংক প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা বেশি ঋণ দিয়েছে। এ অনুপাত সীমার মধ্যে আনতে ব্যাংকটিতে ঋণ ফিরিয়ে আনতে হবে, অথবা আমানত বাড়িয়ে অনুপাত সমন্বয় করতে হবে। ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তারাই বলছেন, আমানত বৃদ্ধির যে হার, তাতে এ সীমা সমন্বয় করা ব্যাংকটির জন্য কঠিনই।

পরিবর্তনের পরে যা হয়েছে
রাজধানীর র‍্যাডিসন হোটেলে ২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারি এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে ব্যাংকটির তখনকার চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদত্যাগ করেন। পরিবর্তনের কারণ হিসেবে ব্যাংকটিকে জামায়াতমুক্ত করার কথা বলা হয়েছিল। ওই দিন নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেন সাবেক সচিব আরাস্তু খান ও এমডি পদে দায়িত্বে আসেন চট্টগ্রামভিত্তিক এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন ইউনিয়ন ব্যাংকের এমডি আবদুল হামিদ মিঞা। বাজার থেকে নতুন শেয়ার কিনে ব্যাংকটির এসব পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে এস আলম গ্রুপ।

২০১৭ সালের শুরুতে ব্যাংকটির আমানত ছিল ৬৭ হাজার ৮৮৬ কোটি টাকা ও ঋণ ৬১ হাজার ৬৪২ কোটি টাকা। ওই সময়ে ব্যাংকটির ইসলামিক বন্ডে বিনিয়োগ ছিল ৫ হাজার ২০৭ কোটি টাকা। ২০১৮ সালের শুরুতে আমানত বেড়ে হয় ৭৫ হাজার ১৩০ কোটি টাকা ও ঋণ বেড়ে হয় ৭০ হাজার ৯৯ কোটি টাকা।

এ পর্যন্ত মোটামুটি চললেও চলতি পঞ্জিকা বছরের শুরু থেকে ২২ এপ্রিল পর্যন্ত আমানত বেড়ে হয় ৭৬ হাজার ৫৯৬ কোটি টাকা ও ঋণ বেড়ে হয় ৭৪ হাজার ৪১৪ কোটি টাকা। আর এ সময়ে ইসলামিক বন্ডে থাকা বিনিয়োগও শূন্য করে ফেলে ব্যাংকটি। ইসলামিক বন্ডে থাকা ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি তুলে এনে টাকার সংকট মেটায় ব্যাংকটি।

ব্যাংকটির এমডি হিসেবে আবদুল হামিদ মিঞার মেয়াদ শেষ হয় গত ৯ ফেব্রুয়ারি। গতকাল মঙ্গলবার যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি ৩৯৫ দিন ব্যাংকটির এমডি ছিলাম। এ সময়ে ব্যাংকে কোনো সংকট ছিল না। টাকা উদ্বৃত্ত ছিল। এই তিন-চার মাসে হঠাৎ এমন কী সংকট হলো, বুঝতে পারছি না।’

গত ১১ ফেব্রুয়ারি ইসলামী ব্যাংকের এমডির দায়িত্ব পান মাহবুব-উল-আলম। ব্যাংকটির সাম্প্রতিক অবস্থা নিয়ে বক্তব্য জানতে গেলে তাঁর দপ্তর থেকে জানানো হয়, তিনি ব্যস্ত আছেন। আরও জানানো হয়, কথা বলার জন্য ব্যাংকের পর্ষদ গতকাল পর্যন্ত তাঁকে অনুমতি দেয়নি।

আরাস্তু খান পদত্যাগ করার পর ব্যাংকটির নতুন চেয়ারম্যান হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক নাজমুল হাসান। আরাস্তু খান চট্টগ্রামের যে আরমাডা স্পিনিং মিলের প্রতিনিধি হিসেবে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালক ও চেয়ারম্যান হয়েছিলেন, নাজমুল হাসানও সেই কোম্পানির প্রতিনিধি হিসেবেই পরিচালক ও চেয়ারম্যান হয়েছেন।

ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, গতকাল চেয়ারম্যান ব্যাংকে আসেননি। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে গিয়ে তাঁর দেখা মেলে। ব্যাংকের সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি ব্যাংকের বিষয়ে কোনো কথা বলতে চাই না। অন্তত বিশ্ববিদ্যালয়ে বসে তো বলবই না।’ সার্বিকভাবে ইসলামী ব্যাংক ভালো আছে বলে জানান তিনি।

বিদেশি মালিকানাও কমেছে
ইসলামী ব্যাংকে শুরু থেকেই বিদেশি মালিকানা ছিল। পটপরিবর্তনের পর তাঁদের অনেকেই ব্যাংকের মালিকানা ছেড়ে দেন। বড় এই পরিবর্তনের পর ব্যাংকটির ৮ কোটি ৬৯ লাখ শেয়ার বিক্রি করে উদ্যোক্তা পরিচালক ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইডিবি)। আইডিবির ছেড়ে দেওয়া সিংহভাগ শেয়ার কিনে নেয় এক্সেল ডাইং অ্যান্ড প্রিন্টিং।

আবার কুয়েতের সরকারি ব্যাংক কুয়েত ফাইন্যান্স হাউস বিক্রি করে প্রায় ২৫০ কোটি টাকার শেয়ার। প্রতিষ্ঠানটির কাছে ইসলামী ব্যাংকের সোয়া ৫ শতাংশ শেয়ার ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংক জেপি মরগানের একজন গ্রাহক ২০১৫ সালের শেষ দিকে ইসলামী ব্যাংকের ৪ দশমিক ১৬ শতাংশ শেয়ার কিনে নিয়েও আবার ছেড়ে দিয়েছেন। ব্যাংকটির শুরুতে বিদেশিদের অংশ ছিল ৭০ শতাংশের মতো, বর্তমানে তা অর্ধেকে নেমে এসেছে।

কিছু বিদেশি প্রতিষ্ঠান ও দেশীয় কয়েকজন ব্যবসায়ীর উদ্যোগে ১৯৮৩ সালে গঠিত হয় ইসলামী ব্যাংক। গত সোমবার পর্যন্ত ব্যাংকটির গ্রাহক ৮৯ লাখ ৫১ হাজার ১৪৯ জন। ইসলামী ব্যাংকে এখন সাড়ে ১৩ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘যতটুকু মনে হচ্ছে ইসলামী ব্যাংকে পারিবারিক নিয়ন্ত্রণটা একটু বেশি হয়ে গেছে এবং গত সপ্তাহে চেয়ারম্যান আরাস্তু খানের পদত্যাগও ওই পারিবারিক নিয়ন্ত্রণের চাপের কারণেই হয়ে থাকতে পারে।’

মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, এক বছরেরও আগে থেকে এ ব্যাংকে যে মালিকানা ও ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনা হয়েছে, তাতে ব্যাংকটির অবস্থা ভালো হলে স্বাগত জানানো যেত। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে নানা সমস্যা ও অস্থিরতা। কতটুকু ভালো করবে, তাতে সন্দেহ হয়।

ইসলামী ব্যাংকের মতো বড় ব্যাংকের পর্ষদে দক্ষ ও নীতিনিষ্ঠ লোকদের আসা উচিত উল্লেখ করে মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘নতুন একজন চেয়ারম্যান এলেন। দেখা যাক তাঁর প্রতিশ্রুতি কতটুকু। অশুভ চাপের কাছে তিনি নতি স্বীকার করছেন কি না, তা-ও দেখার বিষয়।’(প্রথম আলো)

বিঃদ্রঃ- লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করে অন্যকে জানার সুযোগ করে দিন। আপডেট সব খবরা- খবর ও অসাধারণ সব টিপস পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক এবং গ্রুপে জয়েন করে একটিভ থাকুন।

আপনার মন্তব্য লিখুন…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here